পবিত্র মক্কা নগরীর দক্ষিণে একটি ড্রোন প্রতিহত করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথিদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, ১৫ সেপ্টেম্বর একটি শত্রু ড্রোন মক্কার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল এবং সৌদি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেটিকে পবিত্র নগরীর সংরক্ষিত আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ধ্বংস করে। জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি বলেছেন, ড্রোনটির ধ্বংসাবশেষ মক্কার দক্ষিণে জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে এবং এ ঘটনায় পবিত্র নগরীর নিরাপত্তার কোনো ক্ষতি হয়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে গুরুতর নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখছে এবং মক্কা ও মদিনার পবিত্র স্থান ও মুসল্লিদের নিরাপত্তাকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে। তবে ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়: ড্রোনটি আসলে কে ছুড়েছিল? সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সরাসরি হুথিদের দায়ী করলেও ইয়েমেনের হুথি নেতৃত্ব এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। হুথিদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মক্কা বা কোনো পবিত্র স্থানকে লক্ষ্য করে তারা কোনো ড্রোন পাঠায়নি এবং সৌদি অভিযোগকে ভিত্তিহীন প্রচারণা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ফলে ড্রোনটির উৎস, লক্ষ্য এবং প্রকৃত অপারেটর নিয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্যের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
মক্কার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। ১৫ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের জেদ্দা, তায়েফসহ পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় সম্ভাব্য আকাশ হামলার সতর্কতা জারি করা হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসায় সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়। সৌদি পক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, মক্কার দিকে অগ্রসর হওয়া ড্রোনটি সংরক্ষিত আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই প্রতিহত করা হয়। ফলে পবিত্র নগরীতে সরাসরি কোনো হামলা সংঘটিত হয়েছে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং ঘটনাটি ছিল একটি প্রতিহত করার দাবি, যার সঙ্গে হুথিদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি এখনো দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্যে রয়েছে।
মক্কাকে ঘিরে এমন অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে সৌদি আরব হুথিদের বিরুদ্ধে মক্কার দিকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের অভিযোগ তুলেছিল। রিয়াদের দাবি ছিল, ক্ষেপণাস্ত্রটি পবিত্র নগরীর দিকে যাচ্ছিল এবং সৌদি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেটি প্রতিহত করে। হুথিরা তখনও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিল, তারা পবিত্র স্থানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে না। এবারও একই ধরনের অস্বীকৃতি এসেছে। ফলে ২০১৭ সালের ঘটনার পর প্রায় এক দশক পরে মক্কাকে ঘিরে একই ধরনের অভিযোগ নতুন করে সামনে আসায় বিষয়টি সৌদি-হুথি সংঘাতের একটি সংবেদনশীল অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।
এদিকে মক্কার ড্রোন বিতর্কের মধ্যেই ইয়েমেনের মারিব গভর্নরেটে একটি সৌদি F-15 যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে হুথিরা। হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, স্থানীয়ভাবে তৈরি ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে বিমানটি ধ্বংস করা হয়েছে। হুথিদের প্রকাশ করা ভিডিওতে একটি বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষ দেখানো হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে ভিডিও ও দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং সৌদি সরকার বা সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এখনো যুদ্ধবিমান হারানোর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
এই দুই ঘটনা একই সময়ে সামনে আসায় সৌদি-হুথি সংঘাতের সামরিক মাত্রা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। হুথিরা দাবি করছে, তারা সৌদি ভূখণ্ডে হামলার পাশাপাশি সৌদি বিমান ও সামরিক স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্য করছে। অন্যদিকে সৌদি আরব ইয়েমেনে হুথিদের অবস্থানে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি সামরিক দাবি ও হামলার খবর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। একই সঙ্গে কোন দাবির কতটা সত্যতা রয়েছে, সেটি নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বাধীন যাচাই বড় একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংঘাতের প্রভাব শুধু সৌদি-ইয়েমেন সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই। লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বাব আল-মান্দেব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হওয়ায় সেখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলও প্রভাবিত হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে হুথিদের হামলা ও সৌদি পাল্টা হামলার কারণে এই অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব আঞ্চলিক অংশীদারদের সহযোগিতাও চাইছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব ফ্রান্স, ব্রিটেন, পাকিস্তান ও মিসরের কাছে বিমান প্রতিরক্ষা সহায়তা চেয়েছে বলে দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টরের মজুত নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সৌদি সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য তখনও পাওয়া যায়নি।
মিসরের সঙ্গে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক যোগাযোগও এই বৃহত্তর নিরাপত্তা পরিস্থিতির অংশ। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ এল-সিসির বৈঠকে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব অঞ্চলে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কায়রো দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেন সংকটে সরাসরি সামরিক অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে। ফলে সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যে ভারসাম্য রাখাও মিসরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে মক্কার কাছে ড্রোন প্রতিহত করার ঘটনাটি এখনো কয়েকটি প্রশ্নের উত্তরহীন অবস্থায় রয়েছে। সৌদি আরব বলছে, হুথিদের পাঠানো ড্রোন মক্কার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল; হুথিরা সেই অভিযোগ অস্বীকার করছে। ড্রোনটির ধ্বংসাবশেষ বা প্রযুক্তিগত পরিচয় সম্পর্কে এমন কোনো স্বাধীন প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি, যা দিয়ে এর উৎস নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায়। একই সময়ে হুথিদের পক্ষ থেকে সৌদি F-15 ভূপাতিত করার দাবি উঠেছে, সেটিও সৌদি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেনি। ফলে মক্কার ঘটনা এবং F-15 হারানোর দাবি আপাতত পরস্পরবিরোধী সামরিক বক্তব্যের মধ্যেই রয়েছে। তবে এসব ঘটনার ধারাবাহিকতা একটি বিষয় স্পষ্ট করছে: সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যকার সামরিক উত্তেজনা আবার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সৌদি ভূখণ্ডের নিরাপত্তা, মক্কার মতো পবিত্র নগরীর আকাশসীমা এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ একই সংঘাতের প্রভাবের মধ্যে চলে এসেছে। পরিস্থিতি আরও বাড়বে, নাকি আঞ্চলিক কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে উত্তেজনা কমবে, সেটিই এখন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
