বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানকে পরাজিত করার পর খুব শিগগিরই হরমুজকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড ঘোষণা করবেন—নিউইয়র্কে শুক্রবার এমন মন্তব্য করে ট্রাম্প ইতোমধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে নতুন ও বিস্ফোরক মাত্রা যোগ করেছেন। তাঁর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরান সামরিক অভিযান, মার্কিন নৌ অবরোধ, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ এবং সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনিশ্চিত আলোচনার মধ্যে রয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। সংঘাতের পর জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে এবং প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনার অন্যতম প্রধান বিরোধের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৪ আগস্ট হরমুজ দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল মাসিক গড়ের নিচে নেমে যায়; আগের দিনের তুলনায় কিছুটা বাড়লেও সামগ্রিক ট্রাফিক যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় অত্যন্ত কম। ইরানের অবস্থান হলো, প্রণালির কিছু অংশ তাদের আঞ্চলিক জলসীমার অন্তর্ভুক্ত এবং এর নিরাপত্তা ও চলাচলের ওপর তেহরানের অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নৌ অবরোধ জোরদার করেছে এবং ওয়াশিংটন জানিয়েছে, অবরোধ দীর্ঘ সময় বজায় রাখার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। ট্রাম্প এই অবরোধকে ‘ইস্পাতের দেয়াল’ হিসেবে বর্ণনা করে দাবি করেছেন, এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষাই করছে না, বরং হরমুজের ওপর নির্ভরশীল বিশ্বের দেশগুলোর জন্যও একটি সেবা হিসেবে কাজ করছে। তবে তেহরান ওয়াশিংটনের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ট্রাম্পের ভূখণ্ড ঘোষণার বক্তব্যের কঠোর জবাব দিয়েছে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি বলেছেন, একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, বিমানবাহী রণতরী, সরকারি আদেশ কিংবা নির্বাচনী বক্তৃতার মাধ্যমে হরমুজ দখল করা সম্ভব নয় এবং ইরান হুমকি বা শক্তি প্রদর্শনে ভীত নয়। হরমুজ নিয়ে এই দ্বন্দ্ব আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে, কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌ চলাচলের জন্য এই জলপথের গুরুত্ব অপরিসীম। কোনো একক রাষ্ট্র একতরফাভাবে হরমুজকে নিজের সার্বভৌম ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার চেষ্টা করলে তা বড় ধরনের আইনি ও কূটনৈতিক সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি আলোচনা কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে। দুই পক্ষই আগের সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে এবং হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে বিরোধ আরও গভীর হয়েছে। ফলে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, যখন সমুদ্রপথে সামরিক চাপ ও অবরোধ অব্যাহত রয়েছে। এই উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ১৪ আগস্ট ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১.৪৫ ডলার বেড়ে ৮৮.৫২ ডলারে এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ১.১৫ ডলার বেড়ে ৮২.৪০ ডলারে দাঁড়ায়; হরমুজে ট্যাংকার হামলা, মার্কিন অবরোধ এবং শান্তি আলোচনায় অগ্রগতির অভাব বাজারে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করেছে। হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নয়, ভারত, বাংলাদেশসহ এশিয়ার বহু আমদানিনির্ভর অর্থনীতিও চাপের মুখে পড়তে পারে। তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের কাঁচামাল, সার ও খাদ্যপণ্যের দামে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি আমদানিকারক হওয়ায় হরমুজ দিয়ে সরবরাহ ব্যাহত হলে দেশটির পরিশোধনাগার ও আমদানি ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে; একইভাবে বাংলাদেশেও জ্বালানি আমদানির ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে এসব প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করবে সংকট কতদিন স্থায়ী হয়, বিকল্প সরবরাহপথ কতটা কার্যকর হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহ কত দ্রুত পাওয়া যায় তার ওপর। এদিকে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি দাবি বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে। ইরান বলছে, প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে রয়েছে, আর ট্রাম্প মার্কিন নৌ অবরোধকে কার্যত পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছেন। কিন্তু জাহাজ চলাচলের তথ্য দেখাচ্ছে, বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়েছে এবং অনেক জাহাজ ঝুঁকি এড়াতে প্রণালি ব্যবহার করছে না। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সর্বশেষ ঘোষণা কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা বাস্তব সামরিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপে রূপ নেবে—এখন সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যদি ওয়াশিংটন সত্যিই হরমুজের ওপর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, তাহলে ইরানের সঙ্গে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে যদি হরমুজের নিরাপদ বাণিজ্যিক চলাচল পুনরুদ্ধার করা যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ কিছুটা কমার সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের ‘মার্কিন ভূখণ্ড’ ঘোষণার হুমকি সেই কূটনৈতিক পথকে আরও কঠিন করে তুলেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোরকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই মুখোমুখি অবস্থান তাই এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির জন্যও ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূরাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
