ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র তত বেশি কৌশলগত ও অর্থনৈতিক চাপে পড়ছে এবং একই সময়ে ইরান তার অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ক্রিস মারফি। তাঁর দাবি, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যে লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছেন, বাস্তব পরিস্থিতি তাতে সাফল্যের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি তৈরি করছে। সোমবার মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম এনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মারফি বলেন, যুদ্ধ যত বেশি সময় চলবে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এর রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক মূল্য তত বাড়বে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ বা সীমিতভাবে ব্যবহৃত থাকায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপরও চাপ বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর। মারফি বলেন, “যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটানো প্রয়োজন, কারণ যুদ্ধ প্রতিদিন যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, আমেরিকা তত দুর্বল হচ্ছে এবং ইরান শক্তিশালী হচ্ছে।” তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার পরিবর্তে একটি কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করা এবং হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল যত দ্রুত সম্ভব স্বাভাবিক করা। এমনকি যুদ্ধ বন্ধ এবং কৌশলগত জলপথটি পুনরায় উন্মুক্ত করার সুযোগ তৈরি হলে সেটি কোনোভাবেই নিখুঁত চুক্তি না হলেও তিনি এমন একটি সমঝোতাকে সমর্থন করবেন বলে জানিয়েছেন। মারফির মতে, আলোচনা যত দীর্ঘ সময় অচলাবস্থায় থাকবে, হরমুজ প্রণালির স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরুদ্ধারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যয়ও তত বাড়তে থাকবে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে হরমুজ প্রণালির ওপর দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা আন্তর্জাতিক তেলবাজার, সরবরাহব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ইরানের সঙ্গে সংঘাতের অবসানে তেহরান ইতোমধ্যে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান বন্ধের মতো বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব দাবির মধ্যে কিছু বিষয় ওয়াশিংটনের জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন হওয়ায় দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার পথ এখনও অনিশ্চিত। তবে মারফির বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে মার্কিন কংগ্রেসের একটি অংশ যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব নিয়ে ক্রমশ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে। তিনি আরও বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন কোনো অর্থায়নে তিনি সমর্থন দেবেন না। তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত পুনর্গঠন এবং ক্ষয়পূরণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগকে তিনি সমর্থন করবেন। তাঁর এই অবস্থান এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তার নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে। সামরিক সংঘাত অব্যাহত থাকলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্কই নয়, বরং উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথও আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। মারফির বক্তব্য মূলত যুদ্ধের সামরিক সমাধানের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমঝোতার পক্ষে মার্কিন রাজনৈতিক বিতর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। তাঁর ভাষায়, সংঘাতের প্রতিটি অতিরিক্ত দিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন ব্যয় ও ঝুঁকি তৈরি করছে, আর ইরানকে তার কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার অতিরিক্ত সময় দিচ্ছে। ফলে যুদ্ধ বন্ধ, আলোচনার পথ পুনরায় চালু এবং হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়টি এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে।
