সাম্প্রতিক সংঘাতের পর ইরান তার ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিচ্ছে বলে দ্য ওয়্যাল স্টিল জার্নাল -এর পর্যালোচিত স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক সপ্তাহ আগেও যেসব ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, ভূগর্ভস্থ টানেল, সেতু, বন্দর এবং সামরিক উৎপাদন স্থাপনায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন ছিল, এখন সেখানে পুনর্নির্মাণ, মাটি অপসারণ, নতুন রাস্তা নির্মাণ এবং অবকাঠামো পুনরুদ্ধারের দৃশ্য স্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে। এই অগ্রগতি ইসরায়েলের নিরাপত্তা মহলে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করেছেন।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানে ইরানের বিভিন্ন কৌশলগত স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ব্যাপক বিমান হামলা চালানো হয়েছিল। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অভিযানের শেষ পর্যায় পর্যন্ত মোট ২০,০০০-এর বেশি হামলা পরিচালিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে। যদিও এই সংখ্যাটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও স্যাটেলাইট চিত্রে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর দ্রুত পুনর্গঠনের ইঙ্গিত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
পশ্চিম ইরানের কাঙ্গাভার অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্র বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মার্চ মাসে ধারণ করা ছবিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত টানেলের প্রবেশমুখ, বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবেশ সড়ক এবং বড় বড় গর্ত দেখা গেলেও, কয়েক সপ্তাহ পর ধারণ করা নতুন ছবিতে একই এলাকায় নতুন করে পাকা রাস্তা নির্মাণ, ধ্বংসাবশেষ অপসারণ এবং নতুন খনন করা টানেল প্রবেশপথের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইঙ্গিত করে যে ইরান ভূগর্ভস্থ সামরিক স্থাপনাগুলো পুনরায় সচল করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কাস্পিয়ান সাগর উপকূলের বান্দর আনজালিতে অবস্থিত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-সংশ্লিষ্ট একটি শিপইয়ার্ডেও পুনর্নির্মাণ কার্যক্রমের চিহ্ন পাওয়া গেছে। একইভাবে তেহরানের নিকটবর্তী ক্ষেপণাস্ত্র যন্ত্রাংশ উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি শিল্পকারখানার ভবনেও আংশিক পুনর্গঠন এবং মেরামতের অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একজন ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা দাবি করেন, তিনটি ভারী বোমার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ইরান মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে তোলে। তার মতে, এটি কেবল ইরানের প্রকৌশল সক্ষমতারই প্রমাণ নয়, বরং সামরিক লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন এবং স্থায়ী ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চিত করার কৌশল নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত আরেকজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন, “ইরান সবকিছু পুনর্নির্মাণ করছে। আমরা এ নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।”
তবে যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নয়। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি এক বিবৃতিতে বলেন, সামরিক অভিযানটি “যেকোনো নিরপেক্ষ মানদণ্ডে একটি সুস্পষ্ট বিজয়” ছিল এবং অভিযানের মূল কৌশলগত লক্ষ্য সফলভাবে অর্জিত হয়েছে। ওয়াশিংটনের মতে, হামলাগুলো ইরানের সামরিক সক্ষমতার ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে এবং পুনর্গঠন কার্যক্রম সেই বাস্তবতাকে পরিবর্তন করে না।
সামরিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে অবকাঠামো পুনর্গঠন যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য স্বাভাবিক কৌশলগত পদক্ষেপ হলেও ইরানের ক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, ভূগর্ভস্থ টানেল এবং সামরিক উৎপাদন স্থাপনা পুনর্নির্মাণের গতি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। ভবিষ্যতে এই অবকাঠামো কত দ্রুত পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরে আসবে এবং তা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে কী প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের প্রধান আলোচ্য বিষয়।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, স্যাটেলাইট চিত্রে পুনর্নির্মাণ কার্যক্রম দৃশ্যমান হলেও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণরূপে সামরিকভাবে কার্যকর হয়েছে কি না বা পূর্বের সক্ষমতা ফিরে পেয়েছে কি না, তা স্বাধীন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মাধ্যমে এখনো নিশ্চিতভাবে যাচাই করা যায়নি। ফলে এ বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের মূল্যায়ন ও দাবির মধ্যে পার্থক্য রয়ে গেছে।
সূত্র:দ্য ওয়্যাল স্টিল জার্নাল
