সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই এর সম্ভাব্য কৌশলগত প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। চুক্তিটিকে কেউ কেউ ইসরায়েলবিরোধী নতুন আঞ্চলিক জোট হিসেবে দেখছেন, আবার অন্য বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর বিকল্প নয়; বরং বহু দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থারই নতুন রূপ।
চুক্তির তাৎপর্য বুঝতে হলে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক জোট গঠনের দীর্ঘ ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এবং স্নায়ুযুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত প্রভাব ঠেকাতে মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলে একাধিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ছিল ১৯৫৫ সালের বাগদাদ প্যাক্ট, যা পরে সেন্ট্রাল ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা সেন্টো নামে পরিচিত হয়। ব্রিটেন, তুরস্ক, ইরান, পাকিস্তান ও ইরাককে নিয়ে গঠিত এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব মোকাবিলা এবং পশ্চিমাপন্থী রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করা। যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিক সদস্য না হলেও ওয়াশিংটন এই কাঠামোর অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিল।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন ফস্টার ডালেসের সময়কার এই ‘প্যাক্টোম্যানিয়া’—অর্থাৎ বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক চুক্তি ও জোট গঠনের প্রবণতা—পরবর্তী কয়েক দশকেও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে বিভিন্ন রূপে ফিরে এসেছে। ইরাকের ১৯৫৮ সালের বিপ্লব, ইরানের ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে বাগদাদ প্যাক্ট শেষ পর্যন্ত বিলুপ্ত হলেও মধ্যপ্রাচ্যে একটি সমন্বিত আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের মার্কিন আকাঙ্ক্ষা পুরোপুরি শেষ হয়নি।
পরবর্তী সময়ে ওয়াশিংটন বিভিন্ন নামে একই ধরনের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করেছে। ২০০৬-০৭ সালে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিৎসা রাইসের ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ ধারণার সঙ্গে আঞ্চলিক সামরিক সহযোগিতার পরিকল্পনাও আলোচনায় আসে। সৌদি আরব, মিসর ও জর্ডানকে যুক্ত করে ইরানকেন্দ্রিক একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর সম্ভাবনা নিয়ে তখন ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এই ধারণা আরও বিস্তৃত হয়ে ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব রাষ্ট্রের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতার দিকে অগ্রসর হয়।
২০২২ সালে ইরানকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব দেশের মধ্যে বিমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতার উদ্যোগ সেই ধারারই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ‘মিডল ইস্ট এয়ার ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ নামে আলোচিত এই কাঠামোকে কিছু পর্যবেক্ষক সম্ভাব্য ‘মধ্যপ্রাচ্য ন্যাটো’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। এর লক্ষ্য ছিল মূলত ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের কাছ থেকে আসতে পারে এমন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হুমকি মোকাবিলায় আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য, রাডার এবং বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সমন্বয় করা।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের মক্কা চুক্তিকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এটি কি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিকল্প কোনো স্বাধীন আঞ্চলিক জোট, নাকি বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে সমান্তরাল ও পরিপূরক একটি কাঠামো?
সমালোচকরা বলছেন, মক্কা চুক্তিকে সরাসরি ইসরায়েলবিরোধী জোট হিসেবে চিহ্নিত করা অতিরঞ্জিত। সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও দুই দেশের মধ্যে বহু বছর ধরে পরোক্ষ যোগাযোগ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিষয়ে অভিন্ন উদ্বেগের বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। তুরস্কের ক্ষেত্রেও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়। অন্যদিকে পাকিস্তানের ইসরায়েল-নীতি দীর্ঘদিন ধরে তাদের বৃহত্তর ফিলিস্তিন নীতি এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
তাই মক্কা চুক্তির সদস্য তিন দেশকে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা বাস্তবতার একটি অতিসরলীকরণ হতে পারে। বিশেষ করে তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য এবং পাকিস্তানও দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতার সম্পর্ক বজায় রেখেছে। সৌদি আরবও ওয়াশিংটনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার। ফলে তিন দেশের সমন্বিত প্রতিরক্ষা উদ্যোগকে ওয়াশিংটনবিরোধী জোট হিসেবে ব্যাখ্যা করার আগে তাদের বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় নিরাপত্তা সম্পর্ক বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
মক্কা চুক্তির কয়েক দিন আগে সৌদি আরবের নেতৃত্বে আরও একটি বহুপক্ষীয় সামরিক উদ্যোগের ঘোষণা এই আলোচনাকে আরও জটিল করেছে। ৩০ জুলাই রিয়াদে সৌদি আরবের সঙ্গে বাহরাইন, বাংলাদেশ, কমোরোস, জিবুতি, মিসর, জর্ডান, কুয়েত, পাকিস্তান, কাতার, সোমালিয়া, সুদান, তুরস্ক এবং ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকারের অংশগ্রহণে একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়। এর ঘোষিত লক্ষ্য ছিল লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব ও এডেন উপসাগরীয় গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা জোরদার করা।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে লোহিত সাগরের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সংকট। গাজা যুদ্ধের পর ইয়েমেনভিত্তিক হুতিদের ইসরায়েল-সংযুক্ত জাহাজে হামলা এবং পাল্টা আন্তর্জাতিক সামরিক অভিযানের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথে ঝুঁকি বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া ‘অপারেশন প্রসপারিটি গার্ডিয়ান’ এই সংকট মোকাবিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক উদ্যোগ ছিল। কিন্তু আঞ্চলিক দেশগুলোর বড় অংশ সেই অভিযানে সরাসরি যুক্ত হতে সতর্ক ছিল, কারণ তারা নিজেদের জনগণের কাছে ইসরায়েল-সমর্থক অবস্থানের অভিযোগে পড়তে চায়নি।
মক্কা চুক্তির ক্ষেত্রেও একই ধরনের কৌশলগত হিসাব কাজ করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান এমন একটি নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে চাইতে পারে, যেখানে তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক নিরাপত্তা অগ্রাধিকার বেশি গুরুত্ব পাবে এবং একই সঙ্গে তারা বিদ্যমান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কও বজায় রাখবে।
এখানেই চুক্তিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সামনে আসে। এটি হয়তো কোনো নতুন ‘তৃতীয় মেরু’ তৈরির ঘোষণা নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা রাজনীতিতে একাধিক স্তরের জোট ও অংশীদারিত্ব তৈরির প্রবণতার প্রতিফলন। একই রাষ্ট্র একই সময়ে ন্যাটো, যুক্তরাষ্ট্র, আঞ্চলিক জোট এবং দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশীদার হতে পারে—বর্তমান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এটি অস্বাভাবিক নয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিন দেশ চুক্তিতে স্বাক্ষর করায় তিনি প্রকাশ্যে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। ওয়াশিংটনের এই প্রতিক্রিয়াও মক্কা চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী কোনো সামরিক জোট হিসেবে দেখার ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
বরং বৃহত্তর চিত্রে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোতে স্থানীয় অংশীদারদের আরও বেশি ভূমিকা দেওয়ার চেষ্টা করছে। ওয়াশিংটনের জন্য এর সুবিধা হলো—আঞ্চলিক মিত্রদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক উপস্থিতির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানো এবং একই সঙ্গে ইরানকেন্দ্রিক আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলায় একটি সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করা।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নিজস্ব কৌশলগত হিসাব নেই। বরং তিন দেশের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার একে অপরের সঙ্গে পুরোপুরি অভিন্নও নয়। সৌদি আরবের প্রধান উদ্বেগ উপসাগরীয় নিরাপত্তা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হুমকি, জ্বালানি অবকাঠামোর সুরক্ষা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। তুরস্কের জন্য সিরিয়া, ইরাক, কৃষ্ণসাগর, ভূমধ্যসাগর এবং কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের নিরাপত্তা অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে রয়েছে ভারত, আফগানিস্তান, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্য। ফলে তিন দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, তাদের সব কৌশলগত সিদ্ধান্ত একই দিকে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
চুক্তিতে মিসর ও জর্ডানের অনুপস্থিতিও এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ। দুটি দেশই যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক মিত্র এবং ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি রয়েছে। তাদের মক্কা কাঠামোর বাইরে থাকা থেকে বোঝা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা জোটের প্রশ্নে দেশগুলোর অবস্থান এখনো গভীরভাবে বিভক্ত এবং প্রত্যেক রাষ্ট্র নিজস্ব নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্য বিবেচনা করছে।
এই বাস্তবতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—মধ্যপ্রাচ্যে এখন আর একক কোনো নিরাপত্তা কাঠামো পুরো অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণ করছে না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সম্পর্ক, ন্যাটোর উপস্থিতি, আরব রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব সামরিক উদ্যোগ, ইসরায়েল-আরব নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং তুরস্ক-পাকিস্তান-সৌদি আরবের মতো রাষ্ট্রগুলোর নতুন অংশীদারিত্ব—সব মিলিয়ে একটি বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে।
মক্কা চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তাই শুধু তিনটি দেশের সামরিক সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব পড়তে পারে ইরানের সঙ্গে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক, ইসরায়েলের আঞ্চলিক অবস্থান, পাকিস্তান-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, তুরস্কের আঞ্চলিক ভূমিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতেও।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত থেকে যায়—মক্কা চুক্তি কি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন কোনো স্বতন্ত্র মেরু তৈরি করবে, নাকি এটি যুক্তরাষ্ট্রের বহু পুরোনো ‘স্থানীয় অংশীদারদের মাধ্যমে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিচালনা’ কৌশলেরই নতুন সংস্করণ হয়ে থাকবে?
সমালোচনামূলক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ইতিহাসের দিকে তাকালে দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটিকেই পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ১৯৫৫ সালের বাগদাদ প্যাক্ট থেকে শুরু করে ২০০০-এর দশকের ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ ধারণা, ২০২২ সালের আঞ্চলিক বিমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং বর্তমানের বহুপক্ষীয় সামরিক কাঠামো—সবকিছুর মধ্যে একটি ধারাবাহিকতা খুঁজে পাওয়া যায়: আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্বে আরও সক্রিয় করা, কিন্তু বৃহত্তর কৌশলগত কাঠামোতে মার্কিন প্রভাব বজায় রাখা।
তবে মক্কা চুক্তিকে শুধু ওয়াশিংটনের প্রক্সি ব্যবস্থা হিসেবেও দেখলে বাস্তবতার একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান প্রত্যেকেই নিজেদের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী বহুমুখী কূটনীতি পরিচালনা করছে। তারা একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে, আবার চীন, রাশিয়া, মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য দেশ এবং নিজেদের আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গেও সম্পর্ক গভীর করছে। এই বহুমুখী কৌশল ভবিষ্যতে মক্কা চুক্তিকে কেবল একটি সামরিক জোট নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সমন্বয়ের প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে পারে।
ফলে মক্কা চুক্তির প্রকৃত তাৎপর্য এখনই নির্ধারণ করা কঠিন। এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তিন দেশের মধ্যে কতটা কার্যকর সামরিক সমন্বয় তৈরি হয়, চুক্তির আওতায় পারস্পরিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রয়োগ কীভাবে হয়, ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সদস্য দেশগুলোর সম্পর্ক কোন দিকে যায় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—এই জোট সংকটের সময়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে কি না।
মধ্যপ্রাচ্য যখন যুদ্ধ, জ্বালানি নিরাপত্তা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এবং বৃহৎ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে, তখন মক্কা চুক্তি সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে। এটি হয়তো কোনো নতুন ‘মধ্যপ্রাচ্য ন্যাটো’র জন্ম নয়; কিন্তু এটি নিঃসন্দেহে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে অঞ্চলটির দেশগুলো আর শুধু বাইরের শক্তির নিরাপত্তা ছাতার নিচে থাকতে চাইছে না—তারা নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামোতেও ক্রমশ সক্রিয় ভূমিকা নিতে চাইছে।
