ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে; আজ শনিবার পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দেশটির রাজধানী ইসলামাবাদে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে এবং আলোচনাকে সামনে রেখে ইতোমধ্যেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা সেখানে পৌঁছেছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়, এতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ কয়েকজন নেতা নিহত হন এবং সামরিক ও বেসামরিক বহু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়; গত পাঁচ সপ্তাহে দেশটিতে তিন হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয়, যার মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়, ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দেয়। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়, যার মেয়াদ শেষ হবে ২২ এপ্রিল; এমন পরিস্থিতিতে উভয় দেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা আজ ইসলামাবাদে বসছেন যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনায়। বৈঠকটি এমন সময়ে হচ্ছে যখন দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সীমিত করা এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, অন্যদিকে ইসরায়েল লেবাননে হামলা অব্যাহত রাখায় যুদ্ধবিরতি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। পূর্ণাঙ্গ সমাধানের লক্ষ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আনুষ্ঠানিকভাবে দুই পক্ষকে আমন্ত্রণ জানান এবং হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট জানান, স্থানীয় সময় শনিবার সকালে প্রথম দফার আলোচনা শুরু হবে; ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল জানিয়েছে, এই আলোচনা ১৫ দিন পর্যন্ত চলতে পারে। প্রতিনিধি দলগুলো রাজধানীর রেড জোনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশে সেরেনা হোটেলে অবস্থান করবে, যেখানে মূল বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে; নিরাপত্তার কারণে ৯ ও ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং পুরো শহরে কড়া নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, সঙ্গে থাকবেন স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার; ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, যদিও আইআরজিসির প্রতিনিধিত্ব থাকবে কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে শাহবাজ শরিফ আয়োজক হিসেবে ভূমিকা রাখবেন এবং ইসহাক দার সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তবে সেনাপ্রধান আসিম মুনির অংশ নেবেন কি না তা স্পষ্ট নয়; আলোচনায় দুই পক্ষ আলাদা কক্ষে বসে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান করবে। এই বৈঠকে ভ্যান্সের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ তেহরান তাকে তুলনামূলকভাবে আলোচনায় আন্তরিক মনে করছে। গত কয়েক সপ্তাহে পাকিস্তান ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে এসেছে; ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত ও শিয়া জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটির অনুপস্থিতি পাকিস্তানকে ইরানের কাছে গ্রহণযোগ্য করেছে, আবার ২০০৪ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হওয়ায় ওয়াশিংটনের কাছেও এর গুরুত্ব রয়েছে। আলোচনায় উভয় পক্ষ বড় মতপার্থক্য নিয়ে বসছে—ইরান ১০ দফা শান্তি প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ও মিত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধের দাবি জানিয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ১৫ দফা শর্তে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক কার্যক্রম ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কমানোর বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেছে; হোয়াইট হাউস দাবি করেছে ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছেড়ে দিতে রাজি, যদিও তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার করেনি। লেবানন ইস্যুও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ সেখানে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত রয়েছে; ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে হামলা বন্ধ না হলে তারা যুদ্ধবিরতি থেকে সরে আসতে পারে, অথচ যুক্তরাষ্ট্র বলছে লেবানন এই যুদ্ধবিরতির আওতায় নয়। বিশ্লেষকদের মতে, গভীর অবিশ্বাস ও ভিন্ন অবস্থানের কারণে দ্রুত কোনো চূড়ান্ত সমাধান আসার সম্ভাবনা কম; লেবানন ইস্যুই এখন প্রধান বিভাজন রেখা এবং ইসরায়েলের অনুপস্থিতি আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলছে। তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, ক্লান্তি ও যুদ্ধ থেকে বিরতির প্রয়োজনীয়তা দুই পক্ষকে শেষ পর্যন্ত কিছু বিষয়ে সমঝোতার দিকে নিয়ে যেতে পারে—বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালি খোলার ক্ষেত্রে বহুপক্ষীয় বোঝাপড়ার সম্ভাবনা রয়েছে; তবুও এই শান্তি প্রক্রিয়া দীর্ঘ, জটিল এবং অনিশ্চিতই থেকে যাচ্ছে।
