যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার চলমান সংঘাত নতুন এক জটিল ও অনিশ্চিত পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক উত্তেজনা, কূটনৈতিক অচলাবস্থা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা ঘিরে বৈশ্বিক উদ্বেগ একসঙ্গে এমন একটি পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। জুন মাসে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও তা স্থায়ী হয়নি। পুনরায় সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি আবারও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবহন করা হয়। সাম্প্রতিক সংঘাতের পর ইরানের নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের ফলে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, যার প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে অনুভূত হয়েছে। তেলের দাম বৃদ্ধি, এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং বাণিজ্যিক রুটে নিরাপত্তা ঝুঁকি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ পরিস্থিতিতে ওমানের মধ্যস্থতায় একটি সীমিত সময়ের নিরাপদ নৌপথ চালুর বিষয়ে আলোচনা এগোলেও সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও নৌ-নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মৌলিক মতপার্থক্য এখনো দূর হয়নি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, তারা ইরানকে ঘিরে চলমান নৌ-অভিযানের অংশ হিসেবে একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন, তল্লাশি এবং কিছু জাহাজ অচল করার পদক্ষেপ নিয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এই পদক্ষেপের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অপরদিকে ইরান এসব কর্মকাণ্ডকে নিজেদের সার্বভৌম অধিকার ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে বর্ণনা করছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানকে কঠোর বার্তা দিয়ে বলেছেন, পূর্ণাঙ্গ সমঝোতা অথবা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের বাইরে কোনো বিকল্প নেই। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি এয়ারলাইনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করায় ওয়াশিংটনের কৌশল নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে কঠোর ভাষা, অন্যদিকে সীমিত ছাড়—এই দ্বৈত নীতি আলোচনার পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, তেহরান বর্তমানে কেবল সামরিক শক্তির হিসাব করছে না; বরং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সীমাবদ্ধতাও মূল্যায়ন করছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয়, অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর হুঁশিয়ারিকে ইরান মনস্তাত্ত্বিক চাপ হিসেবে দেখলেও সামরিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছে না।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করলেও ওমানের মাধ্যমে পরোক্ষ যোগাযোগ চলমান থাকার কথা স্বীকার করেছে। আলোচনার মূল লক্ষ্য হরমুজ প্রণালিতে সীমিত সময়ের জন্য নিরাপদ বাণিজ্যিক নৌ-চলাচল নিশ্চিত করা। পাশাপাশি ইরান বিকল্প বাণিজ্যিক রুট তৈরির লক্ষ্যে পাকিস্তানসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করেছে, যাতে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি নৌ অবরোধের অর্থনৈতিক প্রভাব কমানো যায়।
সংকটের সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা হচ্ছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা স্পষ্ট করে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ পথ কোনো একক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন হতে পারে না। ওয়াশিংটনের মতে, নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার অপরিহার্য অংশ। বিপরীতে ইরান দাবি করছে, নিজস্ব উপকূলীয় নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সামরিক হুমকি মোকাবিলায় প্রণালিতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ তাদের জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যও এই সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনসহ ইরান-ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর কার্যক্রম লোহিত সাগর ও আশপাশের সমুদ্রপথে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করেছে। গবেষকদের মতে, এসব গোষ্ঠী কেবল কোনো রাষ্ট্রের নির্দেশে পরিচালিত হয় না; বরং তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক, সামরিক ও আঞ্চলিক স্বার্থও রয়েছে, যা সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করতে পারে।
পর্যবেক্ষকদের ধারণা, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধ ও কূটনীতি—দুই পথই একসঙ্গে এগোচ্ছে। একদিকে সামরিক চাপ, অন্যদিকে ওমানের মধ্যস্থতায় আলোচনার প্রচেষ্টা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সমঝোতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে সার্বভৌমত্ব, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, নৌ অবরোধ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে মৌলিক মতপার্থক্য দূর না হলে স্থায়ী সমাধান অর্জন কঠিন হবে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এখন অনেকটাই হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই কূটনৈতিক ও সামরিক সংকটের ভবিষ্যতের ওপর নির্ভর করছে। ফলে আগামী সপ্তাহ ও মাসগুলোতে ওমানের মধ্যস্থতায় আলোচনার অগ্রগতি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থানের পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক মিত্রদের ভূমিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নজরকাড়া ইস্যুগুলোর একটি হয়ে থাকবে।
হরমুজ সংকটের শেষ কোথায়? দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কায় বিশ্ব
