ইরান থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার হুমকি পাওয়ার পর তুরস্ক সফর শেষে তাঁর দেশে ফেরার পথে নজিরবিহীন গোপন নিরাপত্তা অভিযান চালানো হয়েছিল বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্ট। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকাশ্যে পুরোনো প্রেসিডেন্টবাহী বিমানে উঠে ট্রাম্প সাংবাদিকদের সামনে হাত নেড়ে বিদায় জানালেও তিনি প্রকৃতপক্ষে ওই বিমানে করে যুক্তরাজ্যে যাননি। বরং বিমানবন্দরের একটি সরবরাহকারী গাড়ির মাধ্যমে তাঁকে গোপনে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং কাছাকাছি অবস্থানরত ছোট একটি সামরিক বিমানে তুলে দেওয়া হয়। একই সময়ে সাংবাদিক ও হোয়াইট হাউসের কর্মীদের বহনকারী প্রেসিডেন্টবাহী বিমানটি ট্রাম্পকে বহন করছে—এমন ধারণা তৈরি করে আকাশে উড়ে যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ন্যাটো সম্মেলনে অংশ নিতে ট্রাম্প তুরস্কে পৌঁছেছিলেন কাতারের উপহার দেওয়া নতুন প্রেসিডেন্টবাহী বিমানে। কিন্তু দেশে ফেরার সময় তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে হঠাৎ গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়। মার্কিন নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ইরানের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টার আশঙ্কা দেখতে পাওয়ার পর ট্রাম্পের প্রকৃত অবস্থান গোপন রাখার একটি বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথমে কাতারের দেওয়া নতুন প্রেসিডেন্টবাহী বিমানটি তুরস্ক থেকে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে রওনা হয়। এরপর পুরোনো প্রেসিডেন্টবাহী বিমানটিকে সামনে রেখে তৈরি করা হয় বিভ্রান্তিমূলক ব্যবস্থা। ট্রাম্প প্রকাশ্যে সেই বিমানের সিঁড়ি দিয়ে ওঠেন, সাংবাদিকদের দিকে হাত নাড়েন এবং এমন একটি দৃশ্য তৈরি করা হয় যাতে সবাই মনে করেন তিনিই ওই বিমানে করে তুরস্ক ছাড়ছেন।
কিন্তু বিমানের ভেতরে প্রবেশের পর ট্রাম্পকে গোপনে অন্য পথ দিয়ে বের করে আনা হয়। বিমানবন্দরের একটি সরবরাহকারী গাড়ি বিমানের দরজার কাছে নেওয়া হয় এবং সেই গাড়ির আড়ালে ট্রাম্পকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় কাছাকাছি অবস্থানরত একটি ছোট সামরিক বিমানে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও পৃথকভাবে ওই সামরিক বিমানে ওঠেন।
এরপর সাংবাদিক এবং হোয়াইট হাউসের কয়েকজন কর্মী পুরোনো প্রেসিডেন্টবাহী বিমানেই থেকে যান। তাঁদের অনেকেই জানতেন না যে ট্রাম্প ইতোমধ্যে বিমানটি ছেড়ে অন্য বিমানে উঠে গেছেন। তাঁদের বিমানের জানালার পর্দা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে পুরোনো প্রেসিডেন্টবাহী বিমানটি তুরস্ক থেকে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে উড়ে যায়। বিমানটি এমন একটি সরকারি পরিচয় ব্যবহার করে, যাতে বাইরে থেকে মনে হয় প্রেসিডেন্ট এখনও ওই বিমানের ভেতরেই রয়েছেন। অন্যদিকে ট্রাম্পকে বহনকারী ছোট সামরিক বিমানটি ভিন্ন পরিচয়ে এবং গোপনীয়তার সঙ্গে যুক্তরাজ্যের দিকে উড়ে যায়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ওই বিমানের স্বাভাবিক অবস্থান শনাক্ত করার ব্যবস্থা বন্ধ রাখা হয়েছিল, যাতে ট্রাম্পের প্রকৃত অবস্থান সহজে জানা না যায়।
ট্রাম্পকে বহনকারী সামরিক বিমানটি যুক্তরাজ্যের একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছায়। পরে পুরোনো প্রেসিডেন্টবাহী বিমানটিও সেখানে অবতরণ করে। তবে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পর ট্রাম্প কীভাবে আবার সেই প্রেসিডেন্টবাহী বিমানে ফিরে যান, তার বিস্তারিত পদ্ধতি এখনো স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট।
এরপর ট্রাম্পকে সেই প্রেসিডেন্টবাহী বিমান থেকে প্রকাশ্যে বের হতে দেখা যায়। ফলে বাইরে থেকে এমন ধারণাই তৈরি হয় যে তিনি তুরস্ক থেকে পুরো পথ ওই বিমানেই ভ্রমণ করেছেন। পরে তিনি কাতারের উপহার দেওয়া নতুন প্রেসিডেন্টবাহী বিমানে উঠে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে রওনা হন।
এই পুরো ঘটনাটি সামনে আসার পর মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং তাঁর সঙ্গে ভ্রমণকারী সাংবাদিক ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে সাংবাদিকদের একটি অংশ যদি সত্যিই না জেনে এমন একটি বিমানে যাত্রা করে থাকেন, যেটিকে প্রেসিডেন্টের প্রকৃত অবস্থান আড়াল করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল, তাহলে তাঁদের কতটা তথ্য জানানো হয়েছিল—তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ট্রাম্প নিজেই ইরান থেকে তাঁর বিরুদ্ধে হত্যার হুমকির কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মার্কিন কর্মকর্তারা কতটা কঠোর ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত, তুরস্ক থেকে তাঁর গোপন যাত্রার ঘটনা তারই একটি বিরল উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তায় শত্রুপক্ষকে বিভ্রান্ত করার জন্য একাধিক বিমান ব্যবহারের নজির অতীতেও রয়েছে। তবে এবারের ঘটনায় প্রকাশ্য যাত্রার দৃশ্য তৈরি করে সাংবাদিক ও কর্মীদের একটি বিমানে রেখে প্রেসিডেন্টকে গোপনে অন্য সামরিক বিমানে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ঘটনাটিকে বিশেষভাবে আলোচিত করে তুলেছে।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে প্রকাশ্যে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা অত্যন্ত তীব্র। ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলা এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টা নিয়ে ওয়াশিংটনে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে তুরস্ক থেকে ট্রাম্পের গোপন যাত্রা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থার গভীরতা এবং সম্ভাব্য শত্রুপক্ষকে বিভ্রান্ত করার কৌশল নিয়েও নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে।
সবশেষে, প্রকাশ্যে এক বিমানে ট্রাম্পের ওঠা, সাংবাদিকদের সেই বিমানে যাত্রা করা, আর প্রেসিডেন্টের গোপনে অন্য একটি সামরিক বিমানে চলে যাওয়া—এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ যদি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী হয়ে থাকে, তাহলে এটি মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিদেশ সফরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক অসাধারণ এবং নজিরবিহীন চিত্র তুলে ধরে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, প্রেসিডেন্টকে নিরাপদ রাখতে যে গোপন কৌশল নেওয়া হয়েছিল, সেটি বাস্তবায়নের সময় তাঁর সঙ্গে থাকা অন্য ব্যক্তিদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা হয়েছিল এবং তাঁদের কতটা সত্য তথ্য জানানো হয়েছিল।
ইরানের ভয়ে খাবারের কার্টে লুকিয়ে সামরিক বিমানে উঠে তুরস্ক ছাড়েন ট্রাম্প
