ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সৌদি আরবের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নতুন করে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। কয়েক বছর ধরে তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকা উত্তেজনা আবারও সামরিক সংঘাতের দিকে মোড় নেওয়ায় পুরো অঞ্চলজুড়ে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত কেবল ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে; বরং এর প্রভাব দ্রুতই ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় দেশসমূহ এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র পাকিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সামরিক অবস্থান, প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার এবং কৌশলগত স্বার্থ নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, হুথিদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বিমানবন্দরে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিমান হামলার অভিযোগের পর সৌদি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতির পরিবেশ কার্যত ভেঙে পড়ে এবং উভয় পক্ষের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পাকিস্তানের উচ্চপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ইসলামাবাদ পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে যেকোনো বড় ধরনের হামলাকে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পৃক্ত হিসেবে বিবেচনা করছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের নিরাপত্তা পাকিস্তানের জন্য একটি কৌশলগত ‘রেড লাইন’ এবং প্রয়োজন দেখা দিলে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের বিষয়টিও বিবেচনায় আসতে পারে।
গত বছর সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির পর দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পাকিস্তানের সামরিক সদস্য এবং বিমানবাহিনীর উপাদান সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করছে। ইয়েমেন সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় তাদের উপস্থিতি বর্তমান সংকটকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের হামলার পরিধি বৃদ্ধি পেলে কিংবা সৌদি ভূখণ্ডে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হলে ইসলামাবাদের ওপর সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আমির রানার মতে, আঞ্চলিক উত্তেজনা যেভাবে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে, তা পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের জন্যও একটি অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারিত্ব—এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা ইসলামাবাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও পরিস্থিতি পাকিস্তানের জন্য উদ্বেগজনক। লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং সামুদ্রিক পরিবহন বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। পাকিস্তানের আমদানিকৃত জ্বালানির একটি বড় অংশ এই সামুদ্রিক রুটের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্প উৎপাদন এবং মূল্যস্ফীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। ইতোমধ্যে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন জরুরি প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলেও বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা গুলাম মোস্তফা মনে করেন, বর্তমান মুহূর্তে ইসলামাবাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে উত্তেজনা প্রশমিত করা এবং সব পক্ষকে সংলাপের পথে ফিরিয়ে আনা। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলার মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায় অথবা আঞ্চলিক সংঘাত সরাসরি বিস্তৃত হয়, তাহলে পাকিস্তানের জন্য নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে।
একই সময়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে পাকিস্তান। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ইরানের বেসামরিক নেতৃত্ব এবং দেশটির শক্তিশালী সামরিক কাঠামোর মধ্যে নীতিগত পার্থক্য নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচনা বাড়ছে। এমন প্রেক্ষাপটে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের ইসলামাবাদ সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্পর্ক, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং চলমান সংঘাত নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন, সংলাপ অব্যাহত রাখা এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে। তবে কূটনৈতিক মহলের একাধিক সূত্রের মতে, শান্তিপূর্ণ সমাধানকে অগ্রাধিকার দিলেও সৌদি আরব যদি বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় আনুষ্ঠানিক সামরিক সহায়তা চায়, তাহলে ইসলামাবাদকে অত্যন্ত কঠিন একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকট কেবল ইয়েমেনের যুদ্ধ বা সৌদি-হুথি সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র বৈরিতা, উপসাগরীয় নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে সামান্য একটি সামরিক ভুল হিসাবও বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে দক্ষিণ এশিয়া, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও গভীরভাবে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে এবার সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে পারে পাকিস্তান!
